তেহরানের সিদ্ধান্তে জ্বালানি সরবরাহে বাংলাদেশের স্বস্তি

International

ছবি- সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের তেলবাহী জাহাজ চলাচলে ইরানের ‘সবুজ সংকেত’ দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মেটাতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তেহরানের এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ আগের মতোই চাহিদা অনুযায়ী ক্রুড অয়েল, এলএনজি এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারবে।
জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত চীন থেকে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে আসছিল। ইরান সম্প্রতি চীনের জাহাজ চলাচলে কোনো বিঘ্ন না ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে চীনের কোম্পানি ‘ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত পরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ পাবে। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের ক্রুড অয়েল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় এর আগে ইউনিপ্যাক ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করে তেল রপ্তানি বাতিল করেছিল।
এছাড়া ইরান ভারতীয় জাহাজ না আটকাবেনা। ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাওয়া নিশ্চিত হবে। এতে প্রয়োজনে ভারত থেকে বাড়তি জ্বালানি আমদানির সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।
সাধারণত বিপিসি প্রতি মাসে ১ থেকে ২ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধিত হয়। এই কার্গো পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জিটুজি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে চাহিদার প্রায় পুরো এলপিজি আমদানি করে। এই পণ্যগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়েই বাংলাদেশে আসে। সম্প্রতি প্রণালিটি ব্যবহারে ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ-আড়াইগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছিল। অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো চড়া দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আনতে বাধ্য হচ্ছিল। এখন বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তায় এই গ্যাস সংকটও কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মুনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের তেলবাহী জাহাজ চলাচলে ইরান সরকারের ঘোষণা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে আমাদের আমদানির উৎস বাড়বে এবং প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ওই অঞ্চলের দেশগুলো থেকে পরিশোধিত তেলও আনা যাবে।’
তবে কারিগরি কিছু জটিলতা এখনো কাটেনি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আনতে ‘নরডিক পোলাক্স’ নামে একটি আমেরিকান কোম্পানির জাহাজ ভাড়া করা হয়েছে। জাহাজটি ৪ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাস তানুকা বন্দরে অপেক্ষমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইরান বাংলাদেশি জাহাজ না আটকানোর ঘোষণা দিলেও নরডিক পোলাক্স যেহেতু আমেরিকান মালিকানাধীন, তাই ইরানের লিখিত ক্লিয়ারেন্স ছাড়া এটি হরমুজ প্রণালিতে ঢুকবে না। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইরানের কাছে লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছি। সেটি পেলেই জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবে।’
জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় আগে তুরস্কের একটি জাহাজ ভাড়া করে তেল আনার পরিকল্পনা হয়েছিল, যা এখন আর প্রয়োজন হবে না। এছাড়া যুদ্ধের কারণে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের একটি আমেরিকান জাহাজ বিকল্প পথে আসার জন্য বাড়তি ভাড়া চেয়েছিল, যার চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। এখন স্বাভাবিক ভাড়ায় হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে তেল আনা সম্ভব হবে।
কমোডর মাহমুদুল মালেক সূত্রে আরও জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানির জন্য একটি চীনা জাহাজ ভাড়া করা হয়েছে। জাহাজটি আগামী ২০ এপ্রিল সৌদি আরব পৌঁছাবে এবং তেল লোড করে ২ মে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ও সাবেক বিদ্যুৎ সচিব মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খান বলেন, ‘ইরানের এই ঘোষণা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক। কারণ আমাদের মোট জ্বালানির ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে। তবে এ অঞ্চলের যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই হবে স্থায়ী ও সেরা সমাধান।

What do you feel about this post?

0%
like

Like

0%
love

Love

0%
happy

Happy

0%
haha

Haha

0%
sad

Sad

0%
angry

Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *